Skip to main content

রক্তের সাথে বেঈমানি: মানিকগঞ্জে জুলাইয়ে আহত না হয়েও গেজেটে নাম


বাদ পড়েছেন মাঠের প্রকৃত যোদ্ধারা— বিপ্লবীদের তোপ


স্টাফ রিপোর্টার: জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার অসীম আত্মত্যাগকে পুঁজি করে মানিকগঞ্জে এক নিকৃষ্টতম জালিয়াতির চিত্র ফুটে উঠেছে। কোনো প্রকার আঘাত না পেয়েও সুকৌশলে ‘আহত’ হিসেবে সরকারি গেজেটে নাম লিখিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন মানিকগঞ্জ জেলা শাখার কথিত আহ্বায়ক ওমর ফারুক ওরফে ‘দাড়ি ওমর’ এবং সদস্য সচিব নাহিদ মনির। গত ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত দ্বিতীয় পর্যায়ের গেজেটে এই কথিত সমন্বয়কদের নাম আসতেই জেলাজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। প্রকৃত আহতদের অবজ্ঞা করে সুবিধাবাদীদের এই ‘লিস্ট-বাণিজ্য’কে বিপ্লবের স্পিরিটের ওপর চরম আঘাত হিসেবে দেখছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।


আন্দোলনকারীদের ভাষ্যমতে জানা গেছে, প্রথম ধাপে প্রকৃত কিছু আহতের হাতে অনুদানের চেক হস্তান্তর করা হলেও বিপত্তি বাধে দ্বিতীয় গেজেট প্রকাশের পর। সেখানে এমন কিছু ব্যক্তির নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যারা আন্দোলনের সময় সম্মুখ সারিতে তো দূরে থাক, বিন্দুমাত্র আঁচড়ও পাননি। কোনো হামলার শিকারও হননি। মূলতঃ আন্দোলনে স্বৈরাচার পতনের পর বিশেষ সুবিধা নিতেই তারা বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় পদপদবি বাগিয়েছেন। 


অথচ, মানিকগঞ্জের খালপাড় এলাকায় আন্দোলনের সময় গুরুতর আহত হয়ে দীর্ঘকাল শয্যাশায়ী থাকা আরমানের মতো যোদ্ধাদের নাম রহস্যজনকভাবে তালিকা থেকে গায়েব হয়ে গেছে। ক্ষুব্ধ আরমান জানান, “আমি রাজপথে রক্ত দিয়েছি, আমার সব নথিপত্র জমা দিয়েছি, অথচ দুই দুইবার গেজেট হলেও আমার নাম আসেনি। কিন্তু সুস্থ কিছু ব্যক্তি যারা দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে, সেই কথিত নেতাদের নাম তালিকায় কীভাবে এল? এটা কি আমাদের রক্তের সাথে মশকরা নয়?”


এই ন্যক্কারজনক ঘটনার প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন আন্দোলনের সম্মুখসারির অন্যান্য নেতারাও। 


এদিকে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মানিকগঞ্জ জেলা কমিটির শীর্ষস্থানীয় এক নেতা সদস্য সচিব নাহিদ মনিরকে নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, আন্দোলনের পর নাহিদ মনির হঠাৎ ফোন দিয়ে বললেন তিনি ভবিষ্যতে বিএনপির রাজনীতি করতে চান। কমিটিতে তার নাম রাখলে এটি তার আগামীর জন্য উপকৃত হবে, তাকে মানুষ চিনবে। তখন তাকে সরাসরি না করে দেওয়া হলে তিনি ছলেবলে কৌশলে সদস্য সচিবের পদ বাগিয়ে এনেছেন। পদটি আনতে টাকার ছড়াছড়িও হয়েছে। এ নিয়ে জেলাজুড়ে ঐ সময় ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়। অনেকে পদত্যাগও করে।


তিনি জানান, কথিত আন্দোলনকারী নাহিদ মনির সরাসরি আন্দোলনের নেতৃত্বে বা সম্মুখসারিতে ছিলেন না। মূলতঃ ফটোসেশান করে সেগুলো ফেইসবুকে প্রচার করে ত্যাগী নেতা সেজেছেন। নিজের সুবিধায় ও গা বাচাতে ছাত্রলীগের সাথেও গোপন আঁতাত রেখে চলেছেন এই ব্যাক্তি।


এদিকে, ওমর ফারুক ওরফে দাড়ি ওমরকে নিয়েও রয়েছে ব্যপক সমালোচনা। মূলতঃ মূল আন্দোলনকারীদের দমিয়ে রাখা ও প্রভাব বিস্তার করতে গ্রুপিং করার উদ্দ্যেশ্যেই এই ব্যাক্তিকে সম্মুখ সারিতে এনে একটি কমিটি বানানো হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বেশ কয়েকজন আন্দোলনকারী। তাদের মতে, আন্দোলনের একটি বৃহৎ অংশ ছিলো মাদ্রাসাকেন্দ্রিক শিক্ষার্থী। মূলতঃ নেতৃত্ব দেবেন্দ্র কলেজে ধরে রাখতে এই নির্লজ্জ পরিকল্পনা সাজিয়ে ওমর ওরফে দাড়ি ওমরকে সামনে আনা হয়। এসময়, ওমর ফারুক ওরফে ফারুক মাহমুদ ওরফে টুপি ওমর নামে আরেক আন্দোলনকারী যিনি আন্দোলনের সম্মুখ সাড়িতে ছিলেন তাকে সুকৌশলে সড়িয়ে দেয়া হয়। অথচ, ফারুক মাহমুদ ওরফে টুপি ওমরের নামেই জেলার সকল কর্মসূচি প্রদান করা হয়েছে।


সজিবুল আহসান নামে এক আন্দোলনকারী জানান, জেলায় আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী, শহরজুড়ে গ্রাফিতি করা ও বিভিন্নভাবে সহায়তাকারীদের সুকৌশলে সড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এসময়, জেলার কর্মসূচি প্রদান করা মূল পেইজটিও হ্যাক করা হয়েছে। এসব কিছু ওমর ফারুক ওরফে দাড়ি ওমর গং করেছে। মূলতঃ এরা জুলাই আন্দোলনকে নস্যাৎ করে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে।


বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মানিকগঞ্জ জেলার মুখপাত্র আসাদুল্লাহ এই ঘটনাকে ‘আবেগের সাথে প্রতারণা’ আখ্যা দিয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, “একটি নির্দিষ্ট মহল সুকৌশলে আমাদের এই পবিত্র আন্দোলনকে বিতর্কিত করার মিশনে নেমেছে। যারা বিন্দুমাত্র আহত হয়নি, কেবল পদের জোরে তাদের নাম গেজেটে ঢোকানো হয়েছে— এটি শহীদ ও আহতদের প্রতি চরম অসম্মান।” 


এরই মধ্যে আহ্বায়ক ওমর ফারুকের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। শিক্ষার্থীরা তাকে ‘বাটপার’ ও ‘জুলাই বিক্রেতা’ আখ্যা দিয়ে তাকে বয়কটের ডাক দিয়েছেন।


সচেতন মহলের মতে, জুলাই বিপ্লবের ফসল ঘরে তুলতে একদল ‘ধান্দাবাজ’ সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তারা বলছেন, “শহীদ ও আহতদের রক্ত বিক্রি করে ব্যক্তিগত ফায়দা হাসিলের সুযোগ এই বাংলাদেশে আর কাউকে দেওয়া হবে না।” 


এদিকে, এ ব্যাপারটি নিয়ে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা এই গেজেট বাতিলের পাশাপাশি দ্রুত একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির মাধ্যমে স্বচ্ছ তালিকা প্রণয়ন এবং এই প্রতারণার সাথে জড়িত ‘কথিত’ সমন্বয়কদের শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। 


মূল আন্দোলনকারী ও শিক্ষার্থীদের সাফ কথা— বিপ্লবীদের রক্ত নিয়ে জুয়া খেলা বন্ধ না হলে এবার মানিকগঞ্জের কথিত প্রতারক সমন্বয়কদের মানিকগঞ্জ থেকে বিতাড়িত করতে রাজপথ আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠবে।

Comments